টাকা পেলেই বনভূমিতে সবকিছুর জায়েস করে দেন বন কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান

জসিম উদ্দিন ঃ
কক্সবাজারের ঈদগাঁও কালো বিড়ালের থাবা থেকে রাহুমুক্ত হতে পারেনি বন বিভাগ। ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের দুর্নীতি, অনিয়মে উজাড় হচ্ছে বন। বনের জমি দেখভাল করার দায়ীত্ব তার থাকলেও উল্টো বনের জমি বাণিজ্যে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় সচেতন মহলের হুঁশিয়ারি, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশেও বন্ধ হচ্ছে না রেঞ্জ কর্মকর্তার দুর্নীতি। ওয়ান-ইলেভেনের আলোচিত ওসমান গনির উত্তরসূরি খ্যাত বন কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান ফুলছড়ি নাপিতখালি এলাকায় ‘বনের রাজা’ হিসেবে রাজত্ব করছেন। তার ভয়াবহ অনিয়মে উজাড় হচ্ছে নাপিতখালি বনভূমি। এমনই অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ঈদগাঁও ফুলছড়ি নাপিতখালি অবস্থিত রেঞ্জ কর্মকর্তার ভবনটি আগাগোড়া একটি দুর্নীতির আখড়া। পানের বরজ থেকে সবজী ক্ষেত পর্যন্ত সব কিছুতেই চলে তার ভয়াবহ বাণিজ্য। বন রক্ষার নামে প্লট বানিয়ে বনের জমি বিক্রি, টাকার বিনিময়ে অবৈধ দখলদারদের পাকা দালান নির্মাণের সুযোগ, পাহাড় কেটে মাটি-বালু বিক্রি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ কামাতেই সময় পার করেন এই রেঞ্জ কর্মকর্তা।
বনে স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা, জোত বিক্রি ও পারমিট সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও ফুলছড়ি সবকিছুই চলছে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের ইশারায়। শুধু তাই নয়, তার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ মদদে বন উজাড় করে কাঠ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। একের পর এক সংরক্ষিত বনাঞ্চল বৃশূন্য করছে রেঞ্জ কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন একটি সংঘবদ্ধ চক্র। শুধু ফুলছড়ি বনাঞ্চল থেকেই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার কাঠ পাচার হচ্ছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বনের জমিতে গ্রাম হয়ে উঠা ভীতিকর এই চিত্র।স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রেঞ্জ কর্মকর্তা এ অফিসে যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছে। হেডম্যান শফি ও গাছ ব্যবসায়ী ওবাইদু নিয়ে একটি চক্র গড়ে তুলেন রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান । ছোটঘরহ নির্মাণ করলে ও হেডম্যান শফি দিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন ওই কর্মকর্তা। এ ছাড়া গাছ ব্যবসায়ী ওবাদুর মাধ্যমে প্লটের গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভিলিজার পাড়া,নাপিতখালি, ফুলছড়ি এলাকায় গিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও ওই এলাকায় নিরীহ লোককে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত বন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বনবিভাগের সংরক্ষিত জমিতে সামাজিক বনায়ন ছাড়া অন্য কোনো কিছুই করার বিধান নেই না থাকলে ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তাকে টাকা দিলেই সবই জায়েজ হয়ে যায়। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্থাপনা করার অনুমোতি থাকায় বেশিরভাগ সংরক্ষিত বনভূমিতে পাকা দালান করতে রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কোন বাধাও আসেনা। টাকায় কেনা সেই জমিতে আধা-পাকা ঘর বা দালান করতে বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা ম্যানেজ করলেই হয়। এ কারণে দিন দিন বন বিভাগের জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। এ সুযোগে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বনের গাছ কেটে জমি দখলে নিয়ে গড়ে তুলছে ঘর-বাড়ি।সরেজমিনে ফুলছড়ি নাপিতখালি, ভিলিজার পাড়া এলাকায় দেখা যায়, চারদিকে বড় বড় পাহাড়ের টিলা আর সারি সারি গাছ এবং তার ভেতরে নতুন নতুন ঘর-বাড়ি। নতুন নতুন টিনের ঘর আর দালানে ভরে গেছে পুরো বনভূমির জায়গা। দেখলেই মনে হয় এ যেন নতুন একটি গ্রাম। এটি বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমি বলে ধারণা করাটাও ভুল হবে বলে জানান স্থানীয় অনেকে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে জমিগুলো সামাজিক বনায়নের নামে দখলে নিয়ে সেখানে নির্মাণ করছেন বড়বড় দালান ও আধাপাকা ঘরবাড়ি। এতে করে সামাজিক বনায়নের নাম করে দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে শ’ শ’ একর বনভূমি।
ভিলিজার পাড়া গ্রামে বনের ভেতর চোখ যেতেই দেখা যায় নির্মাণাধীন ইটের তৈরি দুইটি পাকা ভবন। একটি বাড়ির পুরো কাজ সম্পন্ন হলেও আরেকটি বাড়ির বাকি রয়েছে শুধু ছাদ ঢালাইয়ের কাজ। অপর পাশে রয়েছে মাটির ঘরসহ একাধিক আধা পাকা ও টিনের ঘর। বন বিভাগের বন কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে। আবার টয়লেট, রান্নাঘর, থাকার ঘর ও গরু রাখার ঘরের জন্য আলাদা আলাদা টাকা দিতে হয়েছে। তা না হলেতো ঘর তুলতে দেয় না।তার মতে, এ এলাকাতে পাকা, আধা পাকা ও টিনের শতাধিক বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। তারা সবাই বনবিভাগকে ম্যানেজ করেই বাড়ি নির্মাণ করছে।
একই অবস্থা পাশের বিভিন্ন গ্রামের। সেখানে বসবাস করা লোকজন জানান, তারা বাড়ি করেছেন ৬-৭ মাস আগে। তবে অনেকে নতুন করে আধা-পাকা ঘর নির্মাণের জন্য রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
১০০ গজ দূরেই চোখে পড়লো টিন সেড ভবন। সেখানে গিয়ে খোঁজ করা হয় ভবনের মালিকের। একটু পরেই এসে হাজির এক নারী। তিনি জানান, কিভাবে বন বিভাগের জমিতে ভবন করছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, সরকারি জমি নেওয়া থেকে ভবন নির্মাণের শুরুতে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে। আরো টাকা চেয়েছেন কিন্তু তা দেওয়া হয়েছে কি না আমি জানি না। তবে টাকা দেওয়ার পরই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এখনো শেষ হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে এভাবেই সরকারি জমি প্রভাবশালীরা দখল করে রেখেছেন। আবার সেখানে ঘর-বাড়িও নির্মাণ করছেন। এভাবে চলতে থাকলে পুরো বন উজাড় হয়ে যাবে।
এখন রক্ষক হয়ে নেমেছে ভক্ষকের ভূমিকায়। তারা নিজেরাই এখন হয়ে উঠেছে বন উজারের প্রধান সহায়ক শক্তি এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামতিনি বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ গ্রহণ নতুন কিছুই নয়। বনের যারা রক্ষক তাদের ভক্ষকের ভুমিকায় নামার খবর এর আগেও বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিদিন কাঠ পাচার হওয়ায় অধিকাংশ পাহাড় ও বন বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। দূর থেকে তাকালে মনে হবে বন-পাহাড় কতোই না ঘন-নিবিড়! কিন্তু কাছে গেলেই ভুল ভাঙবে। ভেতরে গেলে দেখা যাবে উজার হওয়া ফাঁকা ভূমি।
বন বিভাগের উদাসীনতার কারণে বনের সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাটি বিক্রি থেকে কমিশন খাওয়া আর করাতকল থেকে মাসিক মাসোহারা নেওয়া বন্ধ হলে পাহাড় ও বনভূমি দখল ৭০% কমে যাবে। এমনটাই মনে করছেন পরিবেশ আন্দোলনের এই নেতা।
টাকা নিয়ে বনের জমিতে সবকিছুর বৈধতার দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে স্থানীয় কিছু লোক তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন দাবি করে মোছারখোলা বিট কর্মকর্তা বেলাল হোসেন বলেন, ইয়াকুব মুস্তফা পাড়ায় যে বাড়ি নির্মাণ করেছে তাকে মামলা দিয়েছি। কোথাও পাহাড় কাটা কিংবা বালু উত্তোলন করা হচ্ছেনা।
গাছ ব্যবসায়ী ওবাদুর সাথে তার কিসের সম্পর্ক এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার বাবা একজন ভিলেজার ছিলেন, একারণে তার সাখে আমার সথ্যতা রয়েছে। এইসব অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দেন কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ মারুফ হোসেন



© 2021 - All Rights Reversed Coxs TV | Web Developed by Hostbuzz Inc