নূরজাহান হোটেলের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে সবশেষ দেখা যায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে
কীভাবে তাজমিনকে নির্জন ধানক্ষেতে নেওয়া হলো? কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে? হত্যার পেছনে কী কারণ ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে বহন করা অটোরিকশার সূত্র ধরেই চালক সুমনের সন্ধান পাওয়া যায়। অন্যদিকে, মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান। তবে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। তার বাবা আবদুল আলীম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যাচ্ছিল না।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। একপর্যায়ে সে কক্সবাজারে যায়। বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরের পর সেখান থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয় কিশোরীটি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে। রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সবশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে।
তবে বাস থেকে নামার পর থেকে লালমাইয়ের জগতপুরের ধানক্ষেতে পৌঁছানো পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা জানতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি তাজমিনকে বহন করে থাকতে পারে এমন অটোরিকশার সন্ধানেও তদন্ত চালানো হয়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাজমিনকে বহন করে থাকতে পারে এমন সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে। অটোরিকশাটি শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে অটোরিকশায় একা থাকার সুযোগে চালক সুমন শহরের দিকে না গিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালাতে থাকেন। তাজমিন একপর্যায়ে বিষয়টি বুঝতে পারে। এরপর অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠায় এবং নিজের লাইভ লোকেশন শেয়ার করে। রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বার্তা দিয়েছিল তাজমিন। তবে গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় সেই বার্তা দেখতে পাননি বাবা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটি বিজরা হয়ে রসুলপুর ও শিকারীপাড়া দিয়ে জগতপুরের ধানক্ষেতের দিকে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাজমিনের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাজমিনের বাবার কাছে পাঠানো বার্তা ও লাইভ লোকেশন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করেও তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশে চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত দেখে কিশোরীটি প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। একপর্যায়ে গামছা পেঁচিয়ে তাজমিনকে হত্যা করা হয়। প্রাথমিকভাবে চালক সুমন একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে পরে মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথাও জানান পুলিশ সুপার। ফলে এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়। পরে অটোরিকশাটির নিবন্ধন ও মালিকের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অটোরিকশার নিবন্ধনের সূত্র ধরে এর মালিককে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন সুমন। এরপর সুমনের অবস্থান শনাক্ত করে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে তিনি লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। তবে পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান তিনি। এরপর আর সেখানে ফেরেননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সুমনের পারিবারিক জীবনের এসব তথ্যও সামনে এসেছে তার গ্রেপ্তারের পর। তবে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
পুলিশ সুপার জানান, সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা মোটিভ অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে বলে শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানান পুলিশ সুপার।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
এদিকে তাজমিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যশোরের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তার বাড়িতে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বাড়িতে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা কেয়া খাতুন। সাংবাদিকেরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।’
মেয়ের বান্ধবীকে নিয়ে অভিযোগ তুলে কেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার মেয়ের বান্ধবীটা অত্যন্ত খারাপ ছিল। সে ফুঁসলিয়ে আমার মেয়েকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত। মেয়েকে বাঁচাতে অনেক বাধা দিয়েছি, অনেক চেষ্টা করেছি; এমনকি এ কারণে ছয় মাস তাকে স্কুলেও যেতে দিইনি। ঘরে আটকে রেখেছিলাম; কিন্তু শেষপর্যন্ত ওই বান্ধবীই তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে গেল। কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরে আসার পরও আর বাসায় পৌঁছতে পারল না আমার মেয়ে। হায়েনার দল তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে ফোনে বলেছিলাম—তুই কোথায় আছিস বল, আমি নিজে এসে তোকে বাড়ি নিয়ে যাব। আজ আমার কলিজার ধনটাকে হারিয়ে ফেললাম, এখন আমি তাকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব!’
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি শোকে স্তব্ধ। তিনি জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল।
আবদুল আলীম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান। বার্তায় তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বার্তাটি দেখেন। পরে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে মেয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
আবদুল আলীম বলেন, তিনি এখন কাউকে নিয়ে অনুমানভিত্তিক অভিযোগ করতে চান না। মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, কারা তাকে হত্যা করেছে এবং ঘটনার পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা জানতে চান। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানান তিনি।



© 2021 - All Rights Reversed Coxs TV | Web Developed by Hostbuzz Inc