আজ, শুক্রবার | ৩রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে

জসিম সিদ্দিকী : কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে কৌশলে সবখানে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। এভাবে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধরা পড়ছে রোহিঙ্গারা। কাজের সন্ধানে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি প্রায় অশান্ত হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। ক্যাম্পে মাদক বিক্রি এবং মাদকের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়েও ঘটেছে অনেক মারামারি খুনাখুনি। তাদের এসব কর্মকান্ডে প্রতিরোধ, নজরদারি এবং রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠাতে ক‚টনৈতিক তৎপরতাসহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়ে সরকার ব্যাপক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে।

জানাগেছে, আটককৃত রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কাজের সন্ধানে বের হয়েছিল। এসব রোহিঙ্গা আটকের ক্ষেত্রে বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও উপজেলা স্কাউট দলের সদস্যরা ভূমিকা পালন করেন।

এ নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের উখিয়ার সভাপতি নূর মোহাম্মদ সিকদার জানান, কাটা তারের বেড়া ও ক্যাম্পের অভ্যন্তরে এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ১০টি চেক পোস্ট ফাঁকি দিয়ে কিভাবে রোহিঙ্গারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি সবাইকে ভাবিযে তুলেছে। নূর মোহাম্মদ সিকদার আরও জানান, সড়কের অসংখ্য চেকপোস্ট ফাঁকি দিযে শত শত রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি নাগরিক সমাজের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা অপরাধসহ মাদক পাচারে জড়িত রোহিঙ্গারা। স্থানীয়দের শ্রম বাজার এখন রোহিঙ্গাদের দখলে। এ বিষয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর নজরদারি করার আহ্বান জানান।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) বিকেলে ৬৪ জন ও আগের দিন বুধবার (৪ আগস্ট) ৩৩ জনসহ ২ দিনে ৯৭ জন রোহিঙ্গা রামু উপজেলা প্রশাসনের হাতে ধরা পড়েছে। এরমধ্যে ইয়াবা পাওয়ায় একজনকে কারাগারে পাঠায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইভাবে গত একমাসে ৪৩৪ জন রোহিঙ্গাকে আটকের পর রোহিঙ্গা শিবিরে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বলেন, ক্যাম্প ছেড়ে পালানোর সময় প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গা ধরা পড়ছে। এভাবে গত ৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩০ দিনে ৪৩৪ জন রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার যারা ধরা পড়েছে এদের মধ্যে মো. আমিন (৩৮) নামে এক যুবকের কাছে ৩টি ইয়াবা পাওয়ায় তাকে ৩ মাসের জেল দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার কাছে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয় পত্রও পাওয়া গেছে।

কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে রামু উপজেলার বেশকিছু পয়েন্টে বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ওই চেক পোস্টগুলোতেই প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে। যারা ধরা পড়ছে সবাই উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে চলে আসার বিষয়টি স্থানীয়দের জন্য খুবই উদ্বেগজনক জানিয়ে প্রণয় চাকমা বলেন, মূলত কাজের সন্ধানে এসব রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে চলে আসছে বলা হলেও নানা অজুহাতে কিন্তু তারা দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা স্থানীয়দের জন্য হুমকি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু উপজেলার সভাপতি মো. আলম বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বা তাদের ম্যানেজ করে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে চলে আসছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এরা আমাদের জন্য বিরাট হুমকি। তিনি আরও বলেন, এসব রোহিঙ্গারা নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বাইরে আসা রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও হুমকির মুখে পড়বে।

কক্সাবজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ্ রেজওয়ান হায়াত বলেন, ক্যাম্পগুলোতে এপিবিএন নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। শিবিরগুলোতে একাধিক নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকার পরও কিভাবে তারা বের হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে থেকে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধাপে প্রায় ১৪ হাজারের অধিক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উপরন্তু, রোহিঙ্গাদের কারণে প্রতিনিয়ত স্থানীয়ভাবে নানা সঙ্কট ও সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখের বেশি।

২০১৭ সালের আগষ্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দমন নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় সাড়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের গেল সাড়ে ৩ বছর ধরে আশ্রয় দিয়ে এক অনন্য উদারণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে বাংলাদেশের এ মানবিকতা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ সাড়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে যে উদারতার পরিচয় দিয়েছে সেটা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ করে কক্সবাজারবাসীদের জন্য অনেক গর্বের বিষয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের এই উদারতার ভূয়সী প্রশংসা হলেও যে দেশের কারনে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে সেই মিয়ানমারের উপর গেল প্রায় ৪ বছরে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তেমন একটা চাপ সৃষ্টি হয়নি। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বছরে গড়ে জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু। বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার একর বনভ‚মি ব্যবহার করছে আশ্রিত এ রোহিঙ্গারা।